Friday, April 3, 2015

৫০ বছরের পথচলা - গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ

৫০ বছরের পথচলাহাঁটি হাঁটি পা পা করে ৫০ বছর বয়স হলো গার্হস্থ্য অর্থনীতি মহাবিদ্যালয়ের। পুরোপরি হাতে-কলমে অনুষ্ঠিত হয় এখানে লেখাপড়া। ঐতিহ্যবাহী এই কলেজ ঘুরে এসে লিখেছেন সৈয়দা আফিয়াত হাসিন
গার্হস্থ্য অর্থনীতি মহাবিদ্যালয়ে স্মাতক সম্মান কোর্সটিকে পাঁচটি বিষয়ে বিভক্ত করে ছাত্রীদের পড়ানো হয়। এগুলো হলো_খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান, বস্ত্র-পরিচ্ছদ ও বয়নশিল্প, গৃহ ব্যবস্থাপনা ও গৃহায়ন, শিশু বিকাশ ও সামাজিক সম্পর্ক এবং ব্যবহারিক শিল্পকলা। ২০০৬ সালে যুক্ত হয় এমএস কোর্স। বিভিন্ন বিভাগের প্রায় তিন হাজার ৫০০ ছাত্রীকে পাঠদানের জন্য রয়েছেন ৫৬ জন শিক্ষক। ১০.৩ একরের ক্যাম্পাসের সামনের অংশে রয়েছে বিভাগীয় সেমিনার, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি, অডিটরিয়াম, প্রার্থনাকক্ষ এবং প্রশাসনিক ও শ্রেণীকক্ষ। লাইব্রেরিতে রয়েছে প্রায় ১১ হাজার বই ও ২০৮টি জার্নাল। ক্যাম্পাসের বাকি অংশে আছে প্রায় ৪৫০ জন ছাত্রীর বাসযোগ্য তিনটি হোস্টেল, শিক্ষক কোয়ার্টার, ক্যাফেটেরিয়া, রেসিডেন্স হাউস, পুকুর, শহীদ মিনার, দুটি খেলার মাঠ এবং শিশুবর্ধন বিভাগের অধীনে নার্সারি স্কুল।
কলেজটির পথচলা শুরু ১৯৬১ সালে, মাত্র ২৫ জন ছাত্রী নিয়ে। দেশ স্বাধীন হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কলেজটি প্রশাসনিক নির্দেশকের দায়িত্বে পরিচালিত হয়। একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
দক্ষতার হাতেখড়ি : গেট দিয়ে ঢুকতেই আচারের দোকানে দেখা গেল ছাত্রীদের ছোটখাটো জটলা। কলেজের বিশেষত্ব কী জানতে চাইলে গৃহ ব্যবস্থাপনা ও গৃহায়ন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী জেনিফারের চটপট জবাব, 'আমাদের এখানে ছাত্ররাজনীতি নেই।' ক্লাসমেট মিতু বলেন, 'কোনো সেশন জটও নেই। সরকারি কলেজ হওয়ায় বেতনও কম। তা ছাড়া এখান থেকে পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট পাওয়া যায়।' শিশুবর্ধন ও সামাজিক সম্পর্ক বিভাগের মাস্টার্সের সুরভী মনে করেন, এখানে পড়াশোনা পেশাসংশ্লিষ্ট হওয়ায় একজন ছাত্রী জীবন যাপন এবং চাকরির বাজারের জন্য দক্ষ হয়ে গড়ে ওঠে। রান্নাবান্না, সেলাই নিয়ে পড়তে হবে শুনে প্রথমে তাঁরও মন খারাপ হতো। এখন হয় না। বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় বিষয়ে হাতে-কলমে পাঠ নিতে পেরে খুব ভালো লাগে। একই বিষয়ের দীপাও মনে করেন, পড়াশোনার সবটাই ব্যবহারিক ক্ষেত্রসংশ্লিষ্ট হওয়ায় পেশাগত দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও পারদর্শী হয়ে ওঠা যায়।
কলেজের বাম পাশের রেসিডেন্স হাউসের জানালার দিকে চোখ পড়তেই দেখা গেল ১০-১২ জনের একটি দল পরম মমতায় গুছিয়ে চলেছে ঘরটিকে। কী হচ্ছে জানতে চাইলে হোম ম্যানেজমেন্টের দিবা জানান, তৃতীয় বর্ষের রেসিডেন্স কোর্সের পরীক্ষা হচ্ছে। তাঁদের ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ১৫ দিন করে এই বাসায় থাকতে হবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে তিনি বলেন, 'এই রুমটি আমাদের ডিপার্টমেন্টের একটা ল্যাবরেটরির মতো। পরীক্ষার সময় এখানে ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন থেকে শুরু করে যাবতীয় ব্যবস্থাপনা হাতে-কলমে করতে হয়।' একটু এগিয়েই বস্ত্র-পরিচ্ছদ ও বয়নশিল্পের সেমিনার রুম। সেখানে বইয়ের আলমারি, টেবিল-চেয়ার ছাড়াও আছে গ্যাসের চুলা, দেয়ালে ঝোলানো জামাকাপড়সহ অনেক কিছুই। পোশাক ডিজাইনের সময় এগুলো ব্যবহার করা হয়। বস্ত্র-পরিচ্ছদের মৌ জানান, শিল্পকলার ল্যাবে কয়েক রকম তাঁতও আছে।
আমরা করব জয় : আকাশভাঙা বৃষ্টিতে ৩ নম্বর হোস্টেলের মাঠটা কাদায় একাকার। সেখানে দেখা মিলল ছয় প্রাণবন্ত তরুণীর। বৃষ্টিতে ভিজে ইচিং-বিচিং খেলছেন। দিবা বলেন, 'পড়াশোনার ফাঁকে অনেক মজা করি। সুযোগ পেলেই আড্ডা জমে ক্যান্টিন, অডিটরিয়াম, বটতলা অথবা ক্লাসের বারান্দায়।' কলেজে প্রতিবছরই থাকে খেলাধুলার আয়োজন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর শিক্ষা সফর তো আছেই।
চাকরির বাজার : কলেজের অধ্যক্ষ লায়লা আরজুমান্দ বানু জানান, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের ফলাফলও অনেক ভালো। প্রতিবছর প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ ছাত্রী প্রথম শ্রেণী পান। সাংস্কৃতিক অঙ্গন, বিএনসিসি, স্কাউটিং এবং খেলাধুলায়ও মেয়েদের রয়েছে সুনাম। এ বছর জাতীয় মহিলা হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতায়ও মেয়েরা ভালো করেছেন। এখান থেকে পাস করার পর ছাত্রীদের পেশাগত ভবিষ্যৎও উজ্জ্বল। গত ৫০ বছরে প্রায় ১৫ হাজার পুষ্টিবিদ তৈরি হয়েছেন। এ ছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ইনস্টিটিউট, ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন ইনস্টিটিউট, শিশুবিষয়ক সংস্থা, হাসপাতাল, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এবং হস্তশিল্প কেন্দ্রগুলোতে প্রচুর ছাত্রী কাজ করছেন।
ছোট ছোট চাওয়া : কলেজের ছাত্রীদের মধ্যে যাঁরা হলে থাকেন না তাঁদের প্রধান সমস্যা যাতায়াত। ছাত্রীদের আরেকটি বড় সমস্যার নাম ফটোকপিয়ার মেশিন। ক্যান্টিনের পাশে থাকা একমাত্র ফটোকপিয়ার মেশিনই তাঁদের ভরসা। শিশুবর্ধনের ইফফাত ফেরদৌস অভিযোগের সুরে জানান, ক্যাম্পাসে একটাই ফটোকপি মেশিন। লম্বা লাইন থাকায় ফটোকপি করতে অনেক সময় নষ্ট হয়। তবে হোস্টেল নিয়ে ছাত্রীদের তেমন অভিযোগ নেই। দিবা বলেন, হোস্টেলের পরিবেশ বেশ ভালো।
অধ্যক্ষের মুখোমুখি : কলেজের সমস্যা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে মতামত জানতে চাইলে অধ্যক্ষ লায়লা আরজুমান্দ বানু বলেন, 'কলেজের সার্বিক উন্নয়নের জন্য আমরা সব সময় সচেষ্ট। এর পরও ছোটখাটো কিছু সমস্যা থাকতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, এগুলো কলেজের ফলাফলকে বাধাগ্রস্ত করছে না।' ২৪ সেপ্টেম্বর কলেজে অনুষ্ঠিত হবে সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসব। তাই পুনর্মিলনীর জন্য রেজিস্ট্রেশন চলছে বলে জানান কলেজের অধ্যক্ষ লায়লা আরজুমান্দ বানু।
কালেরকন্ঠhttp://www.kalerkantho.com/print_edition/?view=details&archiev=yes&arch_date=26-09-2011&feature=yes&type=gold&data=news&pub_no=648&cat_id=3&menu_id=74&news_type_id=1&index=0

0 comments:

Post a Comment